Ticker

6/recent/ticker-posts

গোবিপ্রবিতে প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: ৩ দফা দাবিতে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীরা ন্যায্য তিন দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে অনুষদের শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি প্রকৌশলীরা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তারা অবহেলা, বৈষম্য ও নানা অনিয়মের শিকার হয়ে আসছেন। এ অবস্থায় প্রকৌশলীদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি

সমাবেশে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উপস্থাপন করেন।

প্রথম দাবি: সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তারা বলেন, নবম গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে প্রবেশের ক্ষেত্রে কেবল বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে। কোটার মাধ্যমে কিংবা সমমানের নতুন পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতির সুযোগ পুরোপুরি বাতিল করার আহ্বান জানান তারা।

দ্বিতীয় দাবি: ডিপ্লোমা কোটা বাতিল করতে হবে। বর্তমানে দশম গ্রেডের উপসহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য শতভাগ কোটা নির্ধারিত আছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এটি চরম বৈষম্যমূলক এবং উচ্চশিক্ষিত প্রকৌশলীদের জন্য অবমাননাকর। তাদের মতে, এ পদে ন্যূনতম যোগ্যতা ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও, বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রিধারীদেরও আবেদন করার সুযোগ থাকতে হবে।

তৃতীয় দাবি: “ইঞ্জিনিয়ার” পদবির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমানে নানা অপ্রকৌশলী ব্যক্তি নিজেদের নামের আগে “ইঞ্জিনিয়ার” পদবি ব্যবহার করছেন। এটি প্রকৌশলীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে। তাই শুধু বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারীরাই নামের আগে “ইঞ্জিনিয়ার” লিখতে পারবেন এবং অন্য কেউ ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীরা বলেন, “আমরা ভবিষ্যতের প্রকৌশলী। আমাদের ন্যায্য দাবি পূরণ না হলে আমরা লাগাতার কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবো। দেশের উন্নয়নে প্রকৌশলীরা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু বারবার তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এটি আমরা মেনে নেব না।” আরেকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, “একই যোগ্যতা থাকার পরও শুধু কোটার কারণে অনেক সময় প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এতে প্রকৌশল পেশায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।”

বক্তারা আরও বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করতে শিক্ষার্থীদের চার বছর সময়, প্রচুর অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। অথচ ডিপ্লোমা ডিগ্রি শেষ করেই অনেক সময় সরকারি চাকরিতে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এটি প্রকৌশল পেশাকে অবমূল্যায়ন করছে।

বাংলাদেশে প্রকৌশলীদের পেশাগত মর্যাদা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের বিশেষ সুবিধা এবং বিএসসি ডিগ্রিধারীদের জন্য সীমিত সুযোগ বরাবরই সমালোচিত হয়ে আসছে।

শুধু তাই নয়, ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবির সঠিক ব্যবহার নিয়েও বিস্তর অভিযোগ আছে। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, যাদের প্রকৌশল শিক্ষার কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই তারাও নামের আগে “ইঞ্জিনিয়ার” লিখে থাকেন। এতে প্রকৃত প্রকৌশলীরা সমাজে অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন।

গোবিপ্রবির প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হবে।

বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে স্লোগান দেন। স্লোগানে শোনা যায় “ন্যায্য দাবি মানতে হবে”, “ডিপ্লোমা কোটা বাতিল কর”, “ইঞ্জিনিয়ারের মর্যাদা রক্ষা কর” ইত্যাদি।

পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। 

প্রকৌশল খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। প্রকৌশলীরা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পোন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি সব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাদের মর্যাদা রক্ষায় আইনগত কাঠামো প্রয়োজন।

সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে তারা ধাপে ধাপে কঠোর কর্মসূচি হাতে নেবেন। এর মধ্যে রয়েছে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, কর্মবিরতি এবং সর্বশেষ লাগাতার আন্দোলন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, “আমরা কাউকে বঞ্চিত করতে চাই না। তবে প্রকৌশলীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে যদি কেউ সুযোগ নিতে চায়, তা মেনে নেওয়া হবে না।”


Post a Comment

0 Comments